বিশেষ সংবাদদাতা : জুলাইর গণহত্যার সাথে জড়িতর অভিযোগ রয়েছে। সেই গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রভাবশালী প্রকৌশলী ইলিয়াস আহম্মেদ ও আজমলসহ ১৬ জন প্রকৌশলী এখনও বহাল তবিয়তে ।
তারা সরকারি দায়িত্বে থেকেই তারা ঘুষ, দুর্নীতি, অনিয়ম কমিশনবানিজ্য ও অর্থ পাচারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক বনে গেছেন। তারাই জুলাইর ছাত্র-জনতার হত্যার সাথে ওতপরোতভাবে জড়িত। কারন তাদের অবৈধ অর্থকে বাঁচাইয়া রাখার জন্য ঐ স্বৈরাচারি, ফ্যাসিবাদ সরকারে সন্ত্রাসীদের সাথে হাত মিলিয়ে জনবল দেয়াসহ নগদ কোটি কোটি টাকা দিয়ে আন্দোলন নস্যাৎ করার জন্য চেষ্টা করেছেন। এমনই অভিযোগ উঠেছে শতাধীক প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে।
বর্তমানে তারই একজন ইলিয়াস আহম্মেদ সিলেট গণপূর্ত সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত। তার বিরুদ্ধে দায়ের হয়েছে ২৪ এর জুলাইর গনহত্যার মামলা।(সি.আর নং-১১৮/২০২৫,) যেখানে তিনি ১১০ নম্বর আসামী।
মামলাটি দণ্ডবিধির ১৪৭/১৪৮/৩২৬/৩০৭/৫০৬/৩৪ ধারায় চলমান। অপর দিকে আজিমপুরের শিশু ও লেবার হত্যাসহ নানান অপরাধে জড়িত।
রাজধানীর বাড্ডা,পল্টন, রামপুরা থানা ও সাভার থানায় পৃথক পৃথক হত্যা মামলা রয়েছে তাদের ১৬ জনের নাম। তার মধ্যে রামপুরা থানার মামলা নং -১৮, মামলা রয়েছে অপর দিকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতেও মামলা হয়েছে।বিজ্ঞ আদালত স্বারক নং-২৬৮ তারিখ ২৫/০২/২০২৫ ইং মুলে সি আর মামলা নং -৬৩/২০২৫ বিজ্ঞ আদালতের আদেশ নং সহ ০৩/০৩/২০২৫ ইং, তারিখ প্রাপ্ত হইয়া বাড্ডা থানার মামলা নং- ০৬ তারিখ ০৩/০৩/২০২৫ ধারা -১৪৭/১৪৮/৩২৬/৩০৭/৫০৬/৩৪ পেনাল কোড রুজু হয়েছে। এসব মামলায় ১৬ জন প্রকৌশলীর নাম উল্লেখ করে ২০২৪ নির্যাতিত জনৈক ব্যক্তি মামলা রুজু করেছেন। এদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সক্রিয় সদস্য। আবার কেউ ছিলেন সরাসরি গণভবনকেন্দ্রিক। দুর্নীতির বরপুত্র তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ইলিয়াস আহম্মেদ ও নির্বাহী প্রকৌশলী আজমল হক শত শত কোটি টাকার মালিক । অপরদিকে মন্ত্রী মুক্তাদির চৌধুরীর নির্দেশে ১৮ জুলাই মোঃ শামীম আখতার, প্রধান প্রকৌশলী গনপুর্ত অধিদপ্তর, রামপুরা থানার ১৮/১৯৩ নং হত্যা মামলার ২৮ নং আসামি ও আওয়ামী লীগ নেতা মেহেদী হাসান জয়কে তার ক্যাশিয়ার নুসরাত হোসেনের (বর্তমানে কারাগারে ) মাধ্যমে ৩ কোটি টাকা পৌঁছে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে । বিষয়টি নিয়ে মতামত জানার জন্য একাধীকবার আজমলের মুঠোফোনে ফোন করলে সে রিসিভ করেনি।
এছাড়া দরবেশ খ্যাত সালমান এফ রহমানের নির্দেশে কেরানীগঞ্জের স্থায়ী বাসিন্দা আওয়ামী লীগ নেতা এবং এ হত্যা মামলার ৩২ নং আসামি মোবারকের নিকট নুসরাত হোসেনের মাধ্যমে ২ কোটি টাকা পৌঁছে দেন | এই টাকা যুবলীগের স্থানীয় নেতাকর্মীকে বন্টন করে আন্দোলন পন্ড করার জন্য আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দকে লাঠিসোঠাসহ ব্যাপক উপস্থিতি নিশ্চিত করার জন্য বলেন |
ইলিয়াস আহম্মেদ মামলার আসামী ও দুর্নীতির অভিযুক্ত কর্মকর্তা হয়েও সে এখনও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বহাল আছেন। সরকারি চাকরি বিধি অনুযায়ী অভিযুক্ত ও আদালতে চলমান মামলার কর্মকর্তা সাধারণত প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে বিরত থাকেন; কিন্তু ইলিয়াস আহম্মেদ তার ব্যতিক্রম। ইলিয়াস আহম্মেদ ২০১৫ সাল থেকে ঢাকার বিভিন্ন গণপূর্ত বিভাগে দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রশাসনিক নথি অনুসারে, তার চাকরির সময়সূচি নিম্নরূপ: ২২ এপ্রিল ২০১৫: ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-২, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৬: নড়াইল গণপূর্ত বিভাগ, ১৮ জানুয়ারি ২০১৭: ঢাকা বিভাগ-২
১৮ ডিসেম্বর ২০১৭: আজিমপুর গণপূর্ত বিভাগ, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩: তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, গণপূর্ত সার্কেল-১, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৩: তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, গণপূর্ত সার্কেল, সিলেট ঢাকায় প্রায় এক যুগ দায়িত্ব পালনের সময় তিনি বিতর্কিত ঠিকাদার জি.কে. শামীমের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন বলে সূত্র জানায়। এক সময় জিকে শামীমের সঙ্গে সরকারি কাজের “কমিশন বাণিজ্য” এবং “চুক্তি বণ্টনের কারসাজি” নিয়ে গণপূর্তের অভ্যন্তরে আলোচনা তৈরি হয়। জিকে শামীম-সংযোগে বিতর্ক : ২০১৯ সালে জিকে শামীমের বিরুদ্ধে অর্থপাচার ও চাঁদাবাজির মামলার পর গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা অভিযুক্ত হন। ইলিয়াস আহম্মেদ সরাসরি অভিযুক্ত না হলেও, তার নাম শামীমের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে একাধিক প্রতিবেদনে উঠে আসে। একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইলিয়াস ঢাকায় জিকে শামীমের মাধ্যমে ঠিকাদার নিয়োগ ও কাজ বণ্টনে প্রভাব খাটাতেন। সরকারি নির্মাণ কাজে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার ও বিল ছাড়ের বিনিময়ে মোটা অঙ্কের কমিশন নেওয়া ছিল প্রকাশ্য গোপন খবর।
আজিমপুর গণপূর্তে শিশু জিহাদ ও লেবার হত্যার ঘটনা : ইলিয়াস আহম্মেদের নাম আলোচনায় আসে। ২০১৯ সালের শেষের দিকে আজিমপুরের পিলখানা উপবিভাগের কাজের সময় শিশু জিহাদের মৃত্যু ঘটে। এ ঘটনায় অবহেলা ও নির্মাণ ত্রুটির অভিযোগ ওঠে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, ইলিয়াস আহম্মেদ নিহত শিশুর পরিবারকে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে এবং শিশুর ভাই গোলজারকে গণপূর্ত বিভাগে পিয়ন পদে চাকরি দিয়ে বিষয়টি “মীমাংসা” করে ফেলেন। সেই ঘটনায় প্রশাসনিক তদন্ত হলেও, শেষ পর্যন্ত তিনি কোনোরূপ শাস্তি এড়িয়ে যান। আজিমপুর বিভাগের অধীনে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণ প্রকল্পে ইলিয়াস আহম্মেদের বিরুদ্ধে ঠিকাদার পল্টন দাসের কাছ থেকে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
প্রকল্পটির ব্যয় ছিল প্রায় ১২০ কোটি টাকা। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি “পছন্দের ঠিকাদার” বেছে নিয়ে কাজ দেন এবং নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের বিনিময়ে প্রতি ফ্ল্যাটে ৫৭ লাখ টাকা করে কমিশন গ্রহণ করেন। একজন ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “ইলিয়াস স্যার চুক্তি অনুমোদনের আগে ৫ শতাংশ কমিশন দাবি করতেন। কাজের বিল ছাড় করতে চাইলে আরও ২ শতাংশ দিতে হতো। এই ঘুষ বাণিজ্যে তার নিকট আত্মীয়রাও যুক্ত ছিল। অভিযোগ রয়েছে, তার আপন ভাইকে ঠিকাদার বানিয়ে তিনি গণপূর্তের বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ পাইয়ে দেন এবং কমিশনের ভাগ নিতেন। অবৈধ সম্পদের পাহাড়- দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থে ইলিয়াস আহম্মেদ দেশের ভেতর ও বাইরে বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
তাদের ভাষায়-ঢাকার ধানমন্ডিতে দুটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, নিজ জেলা বরিশালে কোটি টাকায় নির্মিত একটি মসজিদ, বিদেশের মাটিতে দোতলা একটি বাড়ি, এবং ব্যাংক ও আত্মীয়দের নামে বিপুল অর্থের জমা- সবই তার অবৈধ উপার্জনের ফল। এছাড়া ঢাকার অভিজাত হোটেলে ঠিকাদারদের সঙ্গে বিলাসবহুল আসর ও পার্টিতে অংশ নেওয়া, মদ্যপান ও নারীসঙ্গের অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। কারন ইলিয়াস এর স্ত্রী একজন ডাক্তার,সে তার দায়িত্ব নিয়ে সব সময় ব্যাস্ত থাকেন যার ফলে ইলিয়াস প্রায় সময়ই মদপান ও নারী নিয়ে আনন্দ করতেন । জনৈক কর্মকর্তা বলেন, “তিনি নিয়মিতভাবে হোটেল র্যাডিসন ও সোনারগাঁওয়ে ঠিকাদারদের নিয়ে ‘গেট টুগেদার’ আয়োজন করতেন। সেখানে বিলাসিতা ছিল চোখে পড়ার মতো।” বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে বিতর্কিত ভূমিকা ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ঢাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সহিংসতার পেছনে অর্থ সহায়তার অভিযোগ ওঠে ইলিয়াস আহম্মেদের বিরুদ্ধে। অভিযোগ আছে, তিনি সরকারপন্থী একটি গোষ্ঠীর হয়ে “ছাত্রসংগঠনের কার্যক্রমে অর্থ সরবরাহ” করেন। এ ঘটনায় সি.আর মামলা নং ১১৮/২০২৫এ তিনি ১১০ নম্বর আসামী হন। তবে মামলার তদন্ত শেষ না হলেও তাকে সিলেট সার্কেলে পদায়ন করা হয়।
সিলেটে যোগদানের পরও ইলিয়াস আহম্মেদের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সূত্র জানায়, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর বেশ কয়েকটি সরকারি নির্মাণ কাজে ‘নিজস্ব ঠিকাদার’ নিয়োগ দেন। এমনকি নতুন প্রজেক্ট অনুমোদনের ক্ষেত্রেও “কমিশন ছাড়া কোনো কাজ না হওয়া”এমন অভিযোগ স্থানীয় ঠিকাদারদের মুখে শোনা যায়। তাদের ভাষায়, “স্যার এখন সিলেটেও সেই পুরনো পদ্ধতিই চালু রেখেছেন। আগে কমিশন, পরে অনুমোদন। জনমনে প্রশ্ন-ইলিয়াস ২৪ এর গনহত্যার অভিযুক্ত কর্মকর্তা কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে বহাল থাকেন ? প্রশাসনিকভাবে এমন কর্মকর্তা বরখাস্ত বা ওএসডি হওয়ার কথা থাকলেও ইলিয়াস আহম্মেদ বরং পদোন্নতি পেয়েছেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এক সাবেক কর্মকর্তা বলেন, “সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ প্রমাণিত হলে সাধারণত বিভাগীয় তদন্ত হয়। কিন্তু প্রভাবশালী কর্মকর্তারা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থেকে তা এড়িয়ে যান।”
ইলিয়াস আহম্মেদের বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও রয়েছে। সূত্র অনুযায়ী, তিনি মালয়েশিয়া ও দুবাইতে একাধিক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে টাকা স্থানান্তর করেছেন। তার এক সহকর্মী জানান, “তিনি প্রায়ই বিদেশ সফরের নামে ভ্রমণ করতেন। সন্দেহ করা হয়, সেই সময় তিনি বিদেশে টাকা স্থানান্তর করেছেন।”যদিও এসব তথ্যের কোনো সরকারি স্বীকৃতি এখনো পাওয়া যায়নি। ইলিয়াস আহম্মেদের মতো বিতর্কিত কর্মকর্তা গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভাবমূর্তি নষ্ট করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। একজন সিনিয়র প্রকৌশলী বলেন, “যখন দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মকর্তারা পদোন্নতি পান, তখন সৎ কর্মকর্তারা নিরুৎসাহিত হন। ইলিয়াসের মতো কর্মকর্তাদের জন্যই সাধারণ মানুষ গণপূর্তকে দুর্নীতির কেন্দ্র বলে মনে করে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে জানতে ইলিয়াস আহম্মেদের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
Leave a Reply