- – রাজস্ব খাতের ৬৫ লাখ টাকা আত্মসাৎ
- – আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন চোরের পদোন্নতি
- – স্টেরিলাইজার ম্যান ১৪ বছর যাবত ওয়ার্ড মাস্টার
জানা গেছে, মিটফোর্ড হাসপাতালের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেই। তাদের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তারা জোরের সাথে দায়িত্বে রয়েছেন। এমনকি গুরুত্বপূর্ণ পদেও পদোন্নতি নিয়েছেন। এ কারণেই তারা দিন দিন আরো বেপরোয়া হয়ে উঠছে। রাজস্ব খাতের ৬৫ লাখ টাকা আত্মসাৎ, আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন চোরকে প্রশাসনিক পদে পদোন্নতি নেয়া ছাড়াও স্টেরিলাইজার ম্যান ১৪ বছর যাবত ওয়ার্ড মাস্টার হিসেবে দায়িত্ব পালনে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পরও তাকে সরানো হয়নি। এদের বিরুদ্ধে কোনো পরিচালক ব্যবস্থা নিতে গেলেই মারমুখী আচরণ ছাড়াও সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের লিলিয়ে দিয়ে কর্ম বিরতিতে বাধ্য করে ওই অসাধু সিন্ডিকেট। এদিকে, কল্যাণ সমিতির ৬২ লাখ ৪০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেছেন সিন্ডিকেটটি। এর মধ্যে সভাপতি বাবুল (চতুর্থ শ্রেণী), সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মতিন (তৃতীয় শ্রেণী) ও কোষাধ্যক্ষ মনির (চতুর্থ শ্রেণী) কোনো টাকা কোষাগারে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করলেও তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। জাতীয় অডিট কর্মকর্তারা তাদের সরকারি খাতার অনুচ্ছেদ ১০০ তে উল্লেখ করেছেন, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালে গত অর্থবছর ২০২১-২০২২ ও ২০২২-২০২৩ সাল হাসপাতালের অভ্যন্তরে অবস্থিত ৫টি প্রতিষ্ঠানের ভাড়ার টাকা রাজস্ব খাতে জমা না করে ৬২ লাখ ৪০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেছে। তার মধ্যে মৌবন কনফেকশনারি নামে দোকানের মাসিক ভাড়া ২৬ হাজার টাকা করে ২৪ মাসের ৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা, মেডিসিন পয়েন্ট দোকানের মাসিক ভাড়া ২৬ হাজার টাকা করে ২৪ মাসের ৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা, আমানিয়া বেকারির মাসিক ভাড়া ২৬ হাজার করে ২৪ মাসের ৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা, পলি কনফেকশনারি ভাড়া বাবদ ৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা,হোটেল ডিলাক্সের মাসিক ভাড়া ৭৮ হাজার টাকা করে ২৪ মাসে ১৮ লাখ ৭২ হাজার টাকা ও হাসপাতালের ইমারজেন্সি ভবনের দ্বিতীয় তলায় ক্যান্টিনের মাসিক ভাড়া ৭৮ হাজার টাকা করে ২৪ মাসের ১৮ লাখ ৭২ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেছে।
এদিকে, ২০১৩ ও ২০১৪ সালে ওয়ারসি সার্জারিক্যাল থেকে লজিক পি ৫ ইউএসএ নামে দুটি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন ২ কোটি টাকায় ক্রয় করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
এ ছাড়া ২০১৫ সালে চীন সরকারের উপহার বাবদ জিই হেলথ কেয়ার, উহান, চায়না নামক আরেকটি মেশিন হাসপাতালের রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং বিভাগে স্থাপন করে সেবা প্রদান শুরু হয়। এরপর ২০১৭ সালে মাত্র ৪ বছরের মধ্যে দুটো মেশিন নষ্ট হয়ে যায় জানিয়ে পরিত্যক্ত ঘোষণা করতে হাসপাতাল পরিচালক বরাবর আবেদন করা হয়। যদিও নিয়ম ও চুক্তি অনুযায়ী মেশিনগুলোর লাইফ টাইম ১০ বছর ধরা হয়। সে অনুযায়ী মেশিনগুলো যথাক্রমে ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে পরিত্যক্ত হওয়ার কথা। কিন্তু ২০১৮ সালে ওই সব মেশিন সুকৌশলে পরিত্যক্ত মালামালের গোডাউনে রেখে দেয়া হয় এবং ২০২১ সালে মেশিনগুলো লক্ষাধিক টাকায় বিক্রি করে তদস্থলে ভাঙ্গারি দোকান থেকে অন্য মেশিনের খোলস গোডাউনে রেখে দেয়ার অভিযোগে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও দুদক আলাদাভাবে তদন্ত করে অপরাধী সাব্যস্ত করলেও আজও কোনো শাস্তি হয়নি। উল্টো প্রধান অপরাধী হেড কেরানী রহিম ভূইয়াকে প্রশাসনিক পদে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। এমনি করেই পার পেয়ে যাচ্ছে দুর্নীতিবাজরা।
বিষয়টি নিয়ে দৈনিক নয়া দিগন্তে ‘আলট্রাসনোগ্রাম ৩টি মেশিন উধাও’ শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এরপর স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদফতর, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও দুর্নীতি দমন কমিশন পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ সংবলিত নির্দেশনা জারি করে চিঠি দেয়। এসব তদন্তে ছিলেন উপসচিব উম্মে হাবিবা।
অন্য দিকে, আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন চুরির অভিযুক্ত আরেক আসামি ওয়ার্ড মাস্টার বেলাল ১০ বছর যাবত ভারপ্রাপ্ত ওয়ার্ড মাস্টার হিসেবে দায়িত্বে আছেন। অভিযোগ রয়েছে, তার মাসে অবৈধ আয় কমপক্ষে ৫ লাখ টাকা। তার বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেই। লেবার ওয়ার্ডে ২৫ জন দাইমা নেয়া হয়েছে। তাদের অনেকেই নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ প্রতিবেদককে জানান, ওয়ার্ড মাস্টার বেলালকে ৩০ হাজার টাকা করে ঘুষ দিয়ে এ কাজে যোগদান করেছেন তারা। তা ছাড়া প্রতিদিন ২০০ টাকা দিতে হয় তাকে। আউটসোর্সিংয়ের একাধিক কর্মচারী বলেন, নিয়মিত বেতন না হলেও বকশিসের টাকা থেকেও জনপ্রতি ২০০ টাকা দিতে হয় ওয়ার্ড মাস্টার বেলালকে। না দিলে ডিউটি থেকে আউট করার হুমকি দেয় সে।
এদিকে, গত ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট সরকার পতনের পর অফিসে আসেননি বেশ কজন কর্মচারী। তাদের সিগনেচার করেছে বেলাল নিজেই। মাসে ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে। তা ছাড়া ওই তালিকায় আহসান হাবিব সজল ও কাদির অন্যতম। সজল ধানমণ্ডি থানা যুবলীগের নেতা।
এ দিকে, হাসপাতালের দেড় শ বছরের পুরনো পরিত্যক্ত ভবনে বসবাস করছে কিছু ডাক্তার ও অর্ধশতাধিক কর্মচারী। যে কোনো সময় ভবন দুটি ধসে পড়ার কথা গণপূর্ত কর্মকর্তারা জানিয়ে হাসপাতাল পরিচালক বরাবর আবেদন করে। পরে বর্তমান পরিচালক তাদের অন্যত্র থাকার নির্দেশনা দিলেও তারা পরিত্যক্ত ভবন থেকে সরতে নারাজ। এমনকি কর্মচারীদের পরিচালকের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়ে কর্মবিরতির ঘোষণা দেয়। পরে ড্যাবের নেতাদের সহযোগিতায় কর্মচারীরা কাজে যোগ দেয়।
এদিকে, হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আউটসোর্সিং কর্মচারীদের কাছ থেকে মাসে ১৬০০ টাকা কেটে নিচ্ছে সিন্ডিকেট। প্রশাসনিক কর্মকর্তা জাকির বদলি হলেও এ চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি। এখন নিচ্ছেন বর্তমান প্রশাসনিক কর্তা রহিম ভূইয়া।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আউটসোর্সিংয়ের একাধিক কর্মচারী এ প্রতিবেদককে বলেন, তারা অনেকেই বেকার অকর্মা শব্দটি শুনতে কষ্ট পায়। তাই তারা প্রতিবাদ করতে চায় না। কারণ প্রতিবাদ করলে জাকির স্যার অনেককে চাকরিচ্যুত করেছেন। তা ছাড়া মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়ে এ চাকরি নেয়া হয়েছে। আবার অনেকের টাকা পয়সা নিয়েও তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে বলে জানান তারা। এ বিষয়ে মিটফোর্ড হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কাজী মাজহারুল ইসলাম খান নয়া দিগন্তকে বলেন, মিটফোর্ড হাসপাতালের পরিত্যক্ত ভবনে কর্মচারী ও কর্মকর্তা ডাক্তার বসবাস করছেন। তাঁদের সরতে বললেই কর্মবিরতির হুমকি দিচ্ছেন। এ খানে মজবুত সিন্ডিকেট রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
স্বাস্থ্য অধিদফতর মহাপরিচালক আবু জাফর নয়া দিগন্তকে বলেন, অপরাধী যে হোক না কেন, তাকে ছাড় দেয়া হবে না। অভিযুক্তর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সূত্র নয়া দিগন্ত
Leave a Reply