জসিম মেহেদী : একসময় মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের গেটের সামনে পোস্টার বিক্রি করতেন। ঢাকার অলিগলিতে ঘুরে লড়েছেন বেঁচে থাকার লড়াই। সেই হকার থেকে আজ হাজার কোটি টাকার আজাদ প্রোডাক্টসের কর্ণধার—আবুল কালাম আজাদ। কিন্তু সফলতার সিঁড়ি চড়লেও তার বেপরোয়া আচরণ থামেনি। এবার রাজধানীর পল্টনে এক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিককে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ, মারধর, মোটরসাইকেল ভাঙচুর ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
এ ঘটনায় ভুক্তভোগী সাংবাদিক মিজানুর রহমান সুমন রাজধানীর পল্টন থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন (জিডি নং- ১৩৭৯, তারিখ: ১৯/০৭/২০২৬)। ভুক্তভোগী মিজানুর রহমান দৈনিক ‘আমাদের কণ্ঠ’ পত্রিকার সিনিয়র রিপোর্টার হিসেবে কর্মরত।
আবুল কালাম আজাদের ঢাকায় আগমন ও হকার থেকে উত্থান:
চাঁদপুরে জন্ম ও শরীয়তপুরে বেড়ে ওঠা আবুল কালাম আজাদ ১৯৭৩ সালে প্রথম ঢাকায় পা রাখেন। শুরুর দিকে তিনি গৃহশিক্ষক হিসেবে কাজ করতেন এবং ঢাকার গলিতে গলিতে ঘুরে দিনাতপাত করতেন। পরবর্তীতে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের গেটের সামনে পোস্টার বিক্রি শুরু করেন। সেখান থেকে ধীরে ধীরে গড়ে তোলেন ‘আজাদ প্রোডাক্টস’ এবং বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ প্রিন্টিং প্রোডাক্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। তবে তার এই উত্থানের পেছনে ক্ষমতার অপব্যবহার ও আইন অমান্য করার প্রবণতা বারবার প্রকাশ্যে এসেছে।
পল্টনে যেভাবে ঘটল হামলা
জিডি ও ভুক্তভোগী সূত্রে জানা যায়, গত রবিবার (১৯ জুলাই) বেলা পৌনে ১টার দিকে সাংবাদিক মিজানুর রহমান সুমন পল্টনে আজাদ প্রোডাক্টসের সামনে নিজের মোটরসাইকেলটি পার্ক করেন। সেখানকার নিরাপত্তাকর্মীকে বিষয়টি জানিয়ে তিনি পাশের একটি অফিসে যান।
এর কিছুক্ষণ পর নিরাপত্তাকর্মী এসে জানান, আজাদ প্রোডাক্টসের মালিক তাকে ডাকছেন। সাংবাদিক সুমন সেখানে গেলে আবুল কালাম আজাদ তার সাথে অসংলগ্ন ও অপমানজনক আচরণ শুরু করেন এবং অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকেন।
সাংবাদিক সুমন এ আচরণের প্রতিবাদ জানালে আবুল কালাম আজাদ আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। তিনি সুমনের মোটরসাইকেলে আঘাত করেন এবং হেলমেটটি ভেঙে ফেলেন। একপর্যায়ে তিনি ওই সাংবাদিকের গায়ে হাত তোলেন এবং প্রাণনাশের হুমকি দেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
বিতর্কের দীর্ঘ ইতিহাস: পুলিশ পিটানো থেকে কর ফাঁকি
আজাদ প্রোডাক্টসের মালিকের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যকে লাঞ্ছিত করা ও সরকারি রাজস্ব ফাঁকির ঘটনা এটাই প্রথম নয়। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে তার বিরুদ্ধে গুরুতর নানা অভিযোগ উঠেছে:
পুলিশ কর্মকর্তাকে মারধর (২০০৯): ২০০৯ সালে পল্টনের গ্র্যান্ড আজাদ হোটেল থেকে মধ্যরাতে আবুল কালাম আজাদকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সে সময় এক পুলিশ কর্মকর্তাকে মারধর ও হেনস্তার অভিযোগে তাকে একদিনের রিমান্ডেও নেওয়া হয়েছিল।
কোটি টাকার কর ফাঁকি (২০২৩): ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৪৩ লাখ ৯৩ হাজার ৫২ টাকা পৌর কর বকেয়া রাখায় ২০২৩ সালে স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। ২০১০-১১ অর্থবছর থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছর পর্যন্ত বারবার তাগাদা দেওয়ার পরও তিনি এই কর পরিশোধ করেননি।
জনমনে ক্ষোভ ও আইনি ব্যবস্থার দাবি
একজনের পর একজন পুলিশ কর্মকর্তা, সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং এবার সংবাদকর্মীর ওপর এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের ঘটনায় সাধারণ মানুষ ও সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ হকার থেকে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী হয়ে ওঠার পর বারবার আইন অমান্য করার পরও তিনি কোথায় পান এই ক্ষমতার উৎস—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
ব্যবসায়িক পরিচয়ের আড়ালে কোনো প্রভাবশালী মহল বা অবৈধ ক্ষমতার জোর রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখে অভিযুক্ত আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে সুশীল সমাজ ও সাংবাদিক সংগঠনগুলো।
Leave a Reply