বিনোদন ও অপরাধ প্রতিবেদক: ঢাকাই সিনেমার বর্তমান সময়ের আলোচিত মডেল ও অভিনেত্রী স্নিগ্ধা চৌধুরীকে জোরপূর্বক বিয়ের চাপ, ভুল পরিচয়ে টর্চার সেলে আটকে রেখে টানা দুই ঘণ্টা পাশবিক নির্যাতন এবং প্রাণনাশের চেষ্টার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে আশিয়ান গ্রুপ ও আশিয়ান ল্যান্ডস ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে। গত ২৪ জুলাই (শুক্রবার) রাতে ৩০০ ফিট সংলগ্ন আশিয়ান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভেতরের একটি গোপন টর্চার সেলে এই বর্বরতার ঘটনা ঘটে।
এ সময় স্নিগ্ধা চৌধুরীর সঙ্গে থাকা মডেল কো-অর্ডিনেটর ইমনকেও নির্মমভাবে পিটিয়ে তার পায়ের নখ উপড়ে ফেলা হয়েছে বলে জানা গেছে। ঘটনার শিকার স্নিগ্ধা চৌধুরী বাদী হয়ে রোববার (২৬ জুলাই) রাতে রাজধানীর খিলক্ষেত থানায় আশিয়ান গ্রুপের মালিক নজরুলসহ জড়িতদের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেছেন।
বিজ্ঞাপনের আড়ালে ফাঁদ ও টর্চার সেল
ঘটনার বিবরণ দিয়ে ভুক্তভোগী অভিনেত্রী স্নিগ্ধা চৌধুরী জানান, এক বছরের জন্য ২০ লাখ টাকার একটি বিজ্ঞাপনের চুক্তির কথা বলে তাকে আশিয়ান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান মডেল কো-অর্ডিনেটর ইমন। রাত সাড়ে ৮টার দিকে তারা উবারযোগে সেখানে পৌঁছান। ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিয়ন্ত্রিত দরজার নিরাপত্তা বলয় পেরিয়ে ভেতরে ঢোকার পরই দেখা মেলে আশিয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম ভূঁইয়ার। সেখানে তার সহযোগী পলাশ ও নারী পিএস মিয়ামিসহ বেশ কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন।
ভুল পরিচয় ও এপস্টেইন কায়দায় মধ্যযুগীয় বর্বরতা
স্নিগ্ধা চৌধুরী অভিযোগ করেন, কুশল বিনিময়ের কিছুক্ষণের মধ্যেই হিংস্র রূপ ধারণ করেন ব্যবসায়ী নজরুল। তিনি স্নিগ্ধাকে ‘জেবা তাকিয়া’ নামে এক নারীর সাথে গুলিয়ে ফেলে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ তুলে গালিগালাজ শুরু করেন। স্নিগ্ধা নিজেকে উত্তরবঙ্গের মেয়ে এবং তাকিয়া নন বলে বারবার আকুতি জানালেও নজরুল তা কর্ণপাত করেননি।
এক পর্যায়ে হাতে তলোয়ার সদৃশ অস্ত্র উঁচিয়ে এবং স্ট্যাম্প বের করে স্নিগ্ধাকে জোরপূর্বক বিয়ের চাপ দেন নজরুল। প্রাণ বাঁচাতে অভিনেত্রী ভুয়া নামে সই করলেও পরবর্তীতে বাসর করার দাবি তুলে ঘরের সবাইকে বের করে দেন নজরুল। স্নিগ্ধা নিজের শারীরিক অসুস্থতার কথা জানালে আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এই ব্যবসায়ী। মোটা রশি দিয়ে স্নিগ্ধার হাত-পা শক্ত করে বেঁধে সোফায় ফেলে লাঠি দিয়ে দুই পায়ের পাতায় টানা ১৪ বার আঘাত করা হয়। পরবর্তীতে চুল ধরে স্পাইনাল কর্ড, উরু, পিঠ ও হাতে সজোরে পেটাতে থাকেন নজরুল। নির্যাতনের একপর্যায়ে স্নিগ্ধার হাতে কুসুম গরম কফি ঢেলে দেওয়া হয় এবং বিষাক্ত/নেশাজাত দ্রবণ মিশ্রিত কফি পানে বাধ্য করা হয়।
জীবন বাজি রেখে লাফিয়ে পলায়ন
স্নিগ্ধা জানান, একপর্যায়ে নজরুল বুঝতে পারেন যে তিনি আসল ‘জেবা তাকিয়া’ নন। এ সময় হাতের বাঁধন কিছুটা আলগা হলে ফিঙ্গারপ্রিন্ট দেওয়া একটি খোলা দরজা পেয়ে বারান্দা থেকে সোজা নিচে লাফিয়ে পড়েন তিনি। রক্তাক্ত অবস্থায় ৩০০ ফিট রোডে এসে একটি চলন্ত অটোতে উঠে কোনোমতে প্রাণ বাঁচান। বর্তমানে পুরো শরীরে মারাত্মক আঘাতের চিহ্ন নিয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন এই অভিনেত্রী।
ইমনের নখ উপড়ে ফেলা ও অনুসন্ধানে সত্যতা
ঘটনায় জড়িত মডেল কো-অর্ডিনেটর ইমনকেও আশিয়ানের পেটুয়া বাহিনী নির্মম নির্যাতন করে পায়ের নখ উপড়ে ফেলেছে। ইমনের স্ত্রী মুঠোফোনে জানান, নির্যাতনের শিকার ইমন বর্তমানে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় চিকিৎসাধীন।
ঘটনার সত্যতা অনুসন্ধানে জানা গেছে, স্নিগ্ধা চৌধুরীর উবার বুকিংয়ের ডিজিটাল স্লিপ, মোবাইল লোকেশন এবং বর্ণনার সাথে আশিয়ান মেডিকেলের সুড়ঙ্গ সদৃশ গোপন কক্ষ ও টর্চার সেলের মিল পাওয়া গেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আশিয়ান গ্রুপের নজরুল একজন দুর্ধর্ষ ও সাইকোপ্যাথ প্রকৃতির লোক। হাসপাতালে টর্চার সেল বানিয়ে প্রায়ই সাধারণ মানুষ ও কর্মচারীদের ওপর এমন পশুতুল্য নির্যাতন চালিয়ে থাকেন তিনি।
অভিযুক্তের বক্তব্য
এ বিষয়ে আশিয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম ভূঁইয়ার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে স্নিগ্ধা চৌধুরীর ডিজিটাল লোকেশন ট্র্যাকের কথা উল্লেখ করা হলে তিনি বক্তব্য বদলে বলেন, “আমি তাকে ৪ বছর আগে চিনতাম।” পরবর্তীতে তাকে জেবা তাকিয়া মনে করে মারধরের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি এড়িয়ে যান এবং পরদিন সকালে দেখা করার কথা বলে ফোনের সংযোগ কেটে দেন।
বর্তমানে এই জঘন্য ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও অভিযুক্ত ভূমিদস্যু নজরুলের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী নায়িকা স্নিগ্ধা চৌধুরী ও বিনোদন অঙ্গনের কলাকুশলীরা। পুলিশ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে।
Leave a Reply